গ্লোমেরুলাস (Glomerulus)
গ্লোমেরুলাস (Glomerulus) হলো নেফ্রনের রেনাল করপাসলের ভেতরে অবস্থিত একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম রক্তজালিকার কুণ্ডলী। সহজ কথায়, এটি কিডনির ভেতরের আসল "ছাঁকনি" বা ফিল্টার, যার প্রধান কাজ হলো রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ এবং অতিরিক্ত তরল ছেঁকে আলাদা করা। ল্যাটিন শব্দ Glomerulus এর অর্থ হলো "সুতোর ছোট গোলা"। মাইক্রোস্কোপের নিচে এটিকে দেখতে ঠিক সুতোর গোলার মতোই মনে হয়।
গ্লোমেরুলাসের গঠন (Structure)
গ্লোমেরুলাসের রক্ত সঞ্চালন এবং জালিকার গঠনটি সাধারণ রক্তনালীর চেয়ে বেশ আলাদা এবং জটিল:
1. অন্তর্মুখী ধমনিকা বা অ্যাফারেন্ট আর্টেরিওল (Afferent Arteriole):
কিডনির মূল ধমনী (Renal Artery) যখন ভাঙতে ভাঙতে একদম সরু উপশাখায় পরিণত হয়, তখন তার যে শেষ প্রান্তটি রক্ত পরিষ্কার করার জন্য সরাসরি গ্লোমেরুলাসের ভেতরে ঢোকে, তাকেই অন্তর্মুখী ধমনিকা বলে। গ্লোমেরুলাসে ঢোকার ঠিক আগে এই ধমনিকার প্রাচীরের কিছু পেশী কোশ রূপান্তরিত হয়ে বিশেষ জাক্সটাগ্লোমেরুলার কোশ তৈরি করে, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। শরীরের রক্তচাপ বেড়ে গেলে অন্তর্মুখী ধমনিকাটি নিজে থেকেই সংকুচিত হয়ে যায়, যাতে গ্লোমেরুলাসের সূক্ষ্ম কৈশিক নালীগুলো অতিরিক্ত প্রেশারে ফেটে না যায়। শরীরের রক্তচাপ কমে গেলে এটি প্রসারিত (চওড়া) হয়ে যায়, যাতে কম চাপের রক্তও বেশি পরিমাণে ভেতরে ঢুকে ছাঁকনের কাজ সচল রাখতে পারে। শরীরে রক্তের চাপ বা সোডিয়ামের মাত্রা মারাত্মকভাবে কমে গেলে এই ধমনিকার গায়ে থাকা জাক্সটাগ্লোমেরুলার কোশগুলো থেকে রেনিন (Renin) নামক একটি বিশেষ এনজাইম/হরমোন ক্ষরিত হয়। এই রেনিন রক্তচাপ এবং শরীরের জলের ভারসাম্যকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে (RAAS প্রক্রিয়ার মাধ্যমে) সাহায্য করে।
2. কৈশিক জালিকা (Capillary Network):
ক্যাপসুলের ভেতরে ঢুকে অন্তর্মুখী ধমনিকাটি বিভক্ত হয়ে প্রায় 50টি সমান্তরাল কৈশিক নালীর একটি নিরেট কুণ্ডলী তৈরি করে। এই নালীগুলোর দেওয়ালেই আসল ছাঁকনের কাজ চলে। একটি কৈশিক নালীর ব্যাস মাত্র 5 থেকে 10 মাইক্রোমিটার (nm), যা এতটাই সরু যে এর মধ্য দিয়ে লোহিত রক্তকণিকাগুলোকে (RBC) একদম এক লাইনে, একটির পেছনে আরেকটি সারিবদ্ধ হয়ে চলাচল করতে হয়। কৈশিক নালীর প্রাচীর বা দেয়ালটি অত্যন্ত পাতলা। এটি মাত্র একটি স্তরের চ্যাপ্টা এন্ডোথেলিয়াল কোশ (Simple Squamous Endothelium) এবং একটি পাতলা বেসমেন্ট মেমব্রেন দিয়ে তৈরি। এই পাতলা গঠনের কারণেই কোশ ও রক্তের মধ্যে উপাদানের আদান-প্রদান সহজ হয়। কৈশিক নালীর গায়ে ছোট ছোট আণুবীক্ষণিক ছিদ্র বা পোরস(Pores) থাকে, যা দ্রুত ছাঁকন বা আদান-প্রদানে সাহায্য করে। সাধারণ কৈশিক জালিকায় একপ্রান্তে ধমনী ও অন্যপ্রান্তে শিরা থাকে। কিন্তু গ্লোমেরুলাস একটি ব্যতিক্রমী জালিকা, যার উভয় প্রান্তেই ধমনিকা থাকে (ঢোকার মুখে Afferent Arteriole এবং বেরোনোর মুখে Efferent Arteriole)।
3. বহির্মুখী ধমনিকা বা ইফারেন্ট আর্টেরিওল (Efferent Arteriole):
কৈশিক নালীগুলো আবার একত্রিত হয়ে একটি একক নল হিসেবে বওম্যান্স ক্যাপসুল থেকে বের হয়ে আসে। মনে রাখার বিষয় হলো, এই বহির্মুখী ধমনিকাটি অন্তর্মুখী ধমনিকার চেয়ে বেশ সরু বা সংকীর্ণ হয়। বহির্মুখী ধমনিকা বা ইফারেন্ট আর্টেরিওল (Efferent Arteriole) প্রাচীরে মসৃণ পেশী (Smooth Muscle) থাকে, যা রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। গ্লোমেরুলাস (Glomerulus) থেকে বের হওয়ার পরে এটি পেরিটিউবুলার কৈশিক জালিকা (Peritubular Capillaries) অথবা ভাসা রেক্টা (Vasa Recta) গঠন করে।
4. পোডোসাইটের আবরণ:
গ্লোমেরুলাসের এই কৈশিক জালিকাগুলোকে বাইরে থেকে বওম্যান্স ক্যাপসুলের ভিসেরাল স্তরের পোডোসাইট (Podocyte) কোশগুলো আঙুলের মতো প্রবর্ধক দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখে। Podocyte কোশ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে Podocyte-এ Click করুন: Podocyte
গ্লোমেরুলাস কীভাবে কাজ করে? (Mechanism of Function)
গ্লোমেরুলাসের কাজ করার মূল চাবিকাঠি হলো এর ভেতরের উচ্চ রক্তচাপ।
1. হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপ (Glomerular Hydrostatic Pressure): রক্ত অন্তর্মুখী ধমনিকা(Afferent Arteriole) দিয়ে গ্লোমেরুলাসে ঢোকে সেটি চওড়া, কিন্তু বহির্মুখী ধমনিকা বা ইফারেন্ট আর্টেরিওল (Efferent Arteriole) দিয়ে বের হয় যেটা সরু। এর ফলে গ্লোমেরুলাসের ভেতরের কৈশিক জালিকায় একটি তীব্র তরল চাপ বা হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপের সৃষ্টি হয় (যার মান প্রায় 60 mmHg)। এই চাপটি রক্তরসকে গ্লোমেরুলার মেমব্রেন ভেদ করে বওম্যান্স ক্যাপসুলে যেতে বাধ্য করে। এটি পরিশ্রুতকরণের অনুকূলে (filtration-promoting) কাজ করে।
2. আল্ট্রাফিল্ট্রেশন (Ultrafiltration): হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপের কারণে রক্তের প্লাজমা বা রক্তরসে দ্রবীভূত থাকা জল, গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড, ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড এবং খনিজ লবণগুলো কৈশিক নালীর গায়ের সূক্ষ্ম ছিদ্র (Fenestrations) গলে বাইরে বওম্যান্স স্পেসে (Bowman’s Space) বেরিয়ে আসে।
3. রক্তকণিকা আটকে দেওয়া: রক্তের লোহিত রক্তকণিকা (RBC), শ্বেত রক্তকণিকা (WBC), অণুচক্রিকা এবং বড় আকারের প্লাজমা প্রোটিনগুলো আকারে বড় হওয়ায় এই ছাঁকনি পার হতে পারে না। সেগুলো বহির্মুখী ধমনিকা দিয়ে আবার মূল রক্তপ্রবাহে ফিরে যায়।
এই প্রক্রিয়ায় যে পরিশ্রুত তরলটি বওম্যান্স ক্যাপসুলে জমা হয়, তাকে গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেট বলে, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূত্রে পরিণত হয়।
গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন রেট (GFR)
Glomerular Filtration Rate (GFR) বা গ্লোমেরুলার পরিশ্রুতকরণ হার হলো প্রতি মিনিটে দুটি বৃক্কের (Kidney) সমস্ত নেফ্রন মিলে মোট যে পরিমাণ তরল পরিশ্রুত বা ফিল্টার করে। একটি সুস্থ মানবদেহে এর স্বাভাবিক মান প্রতি মিনিটে প্রায় 125mL (বা দিনে প্রায় 180 লিটার রক্তরস পরিশ্রুত হয়, যার সিংহভাগ শরীর আবার শোষন করে নেয়)। Net Filtration Pressure(NFP)-এর ওপর ভিত্তি করেই রক্ত পরিশ্রুত হয়, তাই এই চাপের সামান্য পরিবর্তনও সরাসরি GFR-এর মানকে প্রভাবিত করে। সূত্রানুযায়ী, NFP বাড়লে GFR বাড়ে এবং NFP কমলে GFR কমে।
গ্লোমেরুলার পরিশ্রুতকরণ চাপ (Filtration Pressures)
গ্লোমেরুলার পরিশ্রুতকরণ চাপ (Filtration Pressures) হলো সেই শারীরিক বল বা প্রেশার, যার কারণে গ্লোমেরুলাসের রক্তনালী থেকে রক্তরস ছেঁকে বওম্যান্স ক্যাপসুলের খালি জায়গায় (Bowman's Space) এসে জমা হয়।
রক্ত ছাঁকনের এই পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত 3টি প্রধান চাপের পারস্পরিক টানাটানির ওপর নির্ভর করে। এদের মধ্যে একটি চাপ রক্তকে ছাঁকতে সাহায্য করে (অনুকূল চাপ), আর বাকি দুটি চাপ ছাঁকন প্রক্রিয়ায় বাধা দেয় (প্রতিকূল চাপ)।
1. হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপ (Glomerular Hydrostatic Pressure)(GHP): রক্ত অন্তর্মুখী ধমনিকা(Afferent Arteriole) দিয়ে গ্লোমেরুলাসে ঢোকে সেটি চওড়া, কিন্তু বহির্মুখী ধমনিকা বা ইফারেন্ট আর্টেরিওল (Efferent Arteriole) দিয়ে বের হয় যেটা সরু। এর ফলে গ্লোমেরুলাসের ভেতরের কৈশিক জালিকায় একটি তীব্র তরল চাপ বা হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপের সৃষ্টি হয় (যার মান প্রায় 60 mmHg)। এই চাপটি রক্তরসকে গ্লোমেরুলার মেমব্রেন ভেদ করে বওম্যান্স ক্যাপসুলে যেতে বাধ্য করে। এটি পরিশ্রুতকরণের অনুকূলে (filtration-promoting) কাজ করে।
2. Blood Colloid Osmotic Pressure (BCOP): রক্তের প্লাজমা প্রোটিনগুলো (যেমন অ্যালবুমিন, গ্লোবিউলিন) আকারে বড় হওয়ায় ছাঁকনি পার হতে পারে না এবং গ্লোমেরুলাসের রক্তনালীর ভেতরেই থেকে যায়। এই প্রোটিনগুলো জলের অণুকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে ধরে রাখতে চায়। ফলে প্রোটিনের এই অসমোটিক টান জলকে রক্তনালী থেকে বের হতে বাধা দেয় এবং ভেতরের দিকে টেনে রাখে। এটি পরিশ্রুতকরণের প্রতিকূলে (filtration-opposing) কাজ করে। এর মান সাধারণত প্রায় 32 mmHg.
3. ক্যাপসুলার হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপ (CHP): বোম্যান্স ক্যাপসুলের লুমেন বা গহ্বরে আগে থেকেই যে পরিশ্রুত তরল (filtrate) জমা থাকে, তা নতুন করে তরল আসার পথে একটি বিপরীতমুখী বাধা বা চাপ সৃষ্টি করে। এটি পরিশ্রুতকরণের প্রতিকূলে (filtration-opposing) কাজ করে। এর মান সাধারণত প্রায় 18 mmHg.
গ্লোমেরুলাসে পরিস্রবণ ঘটানোর জন্য কার্যকর নিট চাপকে গ্লোমেরুলার পরিশ্রুতকরণ চাপ (Net Filtration Pressure) বলে, যার মান সাধারণত 10 mmHg।
Clinical Note: ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন বা অটোইমিউন রোগের কারণে গ্লোমেরুলাসে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন হতে পারে, যাকে গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস (Glomerulonephritis) বলা হয়। এতে গ্লোমেরুলাসের ছাঁকনি নষ্ট হয়ে যায় এবং প্রস্রাবের সাথে রক্ত (RBC) ও প্রোটিন বের হতে শুরু করে।
