বোম্যান্স ক্যাপসুল (Bowman's Capsule)


বোম্যান্স ক্যাপসুল (Bowman's Capsule) হলো বৃক্কের (Kidney) রেচন একক বা নেফ্রনের অগ্রভাগে অবস্থিত একটি পেয়ালার মতো বা কাপের আকৃতির দ্বি-স্তরী গঠন। বিজ্ঞানী স্যার উইলিয়াম বোম্যান 1842 সালে এটি আবিষ্কার করেন এবং তাঁর নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয়েছে। গ্লোমেরুলাসকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখে এবং গ্লোমেরুলাস থেকে পরিস্রুত তরল (glomerular filtrate) সংগ্রহ করে।


বোম্যান্স ক্যাপসুলের গঠন (Structure) 

 বোম্যান্স ক্যাপসুল মূলত দুটি স্তর নিয়ে গঠিত এবং এর মাঝখানে একটি ফাঁকা জায়গা থাকে।

1.  প্যারাইটাল স্তর (Parietal layer): এটি ক্যাপসুলের একদম বাইরের স্তর, যা সাধারণ আঁইশাকার উপকলা বা সরল স্কোয়ামাস এপিথেলিয়াম (Simple squamous epithelium) কোশ দ্বারা গঠিত। এটি মূলত ক্যাপসুলের আকৃতি বজায় রাখে। 

2.  ভিসারাল স্তর (Visceral layer): এটি ভেতরের স্তর যা সরাসরি গ্লোমেরুলাসের রক্তনালিকা বা কৈশিক জালিকার সংস্পর্শে থাকে। এই স্তরে বিশেষ এক ধরণের কোশ থাকে যাদের পডোসাইট (Podocyte) বলা হয়। এই কোশগুলোর আঙ্গুলের মতো প্রবর্ধক (pedicels) থাকে, যা ছাঁকনি বা ফিল্টার তৈরিতে প্রধান ভূমিকা নেয়। Podocyte কোশ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে Podocyte-এ Click করুন: Podocyte 

 3. বোম্যান্স স্পেস বা ক্যাপসুলার স্পেস (Capsular space): দুটি স্তরের মধ্যবর্তী খালি অংশকে বোম্যান্স স্পেস বা ক্যাপসুলার স্পেস বলে। গ্লোমেরুলাস থেকে রক্ত পরিশ্রুত হয়ে প্রথমে এই স্পেসেই এসে জমা হয়।


বোম্যান্স ক্যাপসুলের কাজ (Functions) 

  • পরিশ্রুত তরল সংগ্রহ: গ্লোমেরুলার হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপের কারণে রক্ত থেকে যে জল, গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড, ইউরিয়া এবং খনিজ লবণ ছেঁকে বের হয়, বোম্যান্স ক্যাপসুল সেই তরলকে (Glomerular filtrate) সংগ্রহ করে।
  •  ছাঁকন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা: পডোসাইট কোশগুলোর মাঝের সূক্ষ্ম ছিদ্র বা ফিল্ট্রেশন স্লিট  Filtration slits একটি নিখুঁত ছাঁকনি হিসেবে কাজ করে, যা রক্তকণিকা (RBC, WBC) এবং বড় প্লাজমা প্রোটিনকে আটকে দিয়ে কেবল তরল অংশকে নিচে যেতে দেয়। 
  •  পরবর্তী অংশে প্রেরণ: সংগৃহীত পরিশ্রুত তরলকে এটি নেফ্রনের পরবর্তী অংশ অর্থাৎ নিকটবর্তী সংবর্ত নালিকা (Proximal Convoluted Tubule - PCT)-তে পাঠিয়ে দেয়, যেখানে প্রয়োজনীয় উপাদানের পুনঃশোষণ ঘটে।


গ্লোমেরুলাস (Glomerulus)


গ্লোমেরুলাস (Glomerulus) হলো নেফ্রনের রেনাল করপাসলের ভেতরে অবস্থিত একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম রক্তজালিকার কুণ্ডলী। সহজ কথায়, এটি কিডনির ভেতরের আসল "ছাঁকনি" বা ফিল্টার, যার প্রধান কাজ হলো রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ এবং অতিরিক্ত তরল ছেঁকে আলাদা করা। ল্যাটিন শব্দ Glomerulus এর অর্থ হলো "সুতোর ছোট গোলা"। মাইক্রোস্কোপের নিচে এটিকে দেখতে ঠিক সুতোর গোলার মতোই মনে হয়।


গ্লোমেরুলাসের গঠন (Structure)

গ্লোমেরুলাসের রক্ত সঞ্চালন এবং জালিকার গঠনটি সাধারণ রক্তনালীর চেয়ে বেশ আলাদা এবং জটিল:

 1. অন্তর্মুখী ধমনিকা বা অ্যাফারেন্ট আর্টেরিওল (Afferent Arteriole): 

            কিডনির মূল ধমনী (Renal Artery) যখন ভাঙতে ভাঙতে একদম সরু উপশাখায় পরিণত হয়, তখন তার যে শেষ প্রান্তটি রক্ত পরিষ্কার করার জন্য সরাসরি গ্লোমেরুলাসের ভেতরে ঢোকে, তাকেই অন্তর্মুখী ধমনিকা বলে। গ্লোমেরুলাসে ঢোকার ঠিক আগে এই ধমনিকার প্রাচীরের কিছু পেশী কোশ রূপান্তরিত হয়ে বিশেষ জাক্সটাগ্লোমেরুলার কোশ তৈরি করে, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। শরীরের রক্তচাপ বেড়ে গেলে অন্তর্মুখী ধমনিকাটি নিজে থেকেই সংকুচিত হয়ে যায়, যাতে গ্লোমেরুলাসের সূক্ষ্ম কৈশিক নালীগুলো অতিরিক্ত প্রেশারে ফেটে না যায়। শরীরের রক্তচাপ কমে গেলে এটি প্রসারিত (চওড়া) হয়ে যায়, যাতে কম চাপের রক্তও বেশি পরিমাণে ভেতরে ঢুকে ছাঁকনের কাজ সচল রাখতে পারে। শরীরে রক্তের চাপ বা সোডিয়ামের মাত্রা মারাত্মকভাবে কমে গেলে এই ধমনিকার গায়ে থাকা জাক্সটাগ্লোমেরুলার কোশগুলো থেকে রেনিন (Renin) নামক একটি বিশেষ এনজাইম/হরমোন ক্ষরিত হয়। এই রেনিন রক্তচাপ এবং শরীরের জলের ভারসাম্যকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে (RAAS প্রক্রিয়ার মাধ্যমে) সাহায্য করে।

2. কৈশিক জালিকা (Capillary Network): 

            ক্যাপসুলের ভেতরে ঢুকে অন্তর্মুখী ধমনিকাটি বিভক্ত হয়ে প্রায় 50টি সমান্তরাল কৈশিক নালীর একটি নিরেট কুণ্ডলী তৈরি করে। এই নালীগুলোর দেওয়ালেই আসল ছাঁকনের কাজ চলে। একটি কৈশিক নালীর ব্যাস মাত্র 5 থেকে 10 মাইক্রোমিটার (nm), যা এতটাই সরু যে এর মধ্য দিয়ে লোহিত রক্তকণিকাগুলোকে (RBC) একদম এক লাইনে, একটির পেছনে আরেকটি সারিবদ্ধ হয়ে চলাচল করতে হয়। কৈশিক নালীর প্রাচীর বা দেয়ালটি অত্যন্ত পাতলা। এটি মাত্র একটি স্তরের চ্যাপ্টা এন্ডোথেলিয়াল কোশ (Simple Squamous Endothelium) এবং একটি পাতলা বেসমেন্ট মেমব্রেন দিয়ে তৈরি। এই পাতলা গঠনের কারণেই কোশ ও রক্তের মধ্যে উপাদানের আদান-প্রদান সহজ হয়। কৈশিক নালীর গায়ে ছোট ছোট আণুবীক্ষণিক ছিদ্র বা পোরস(Pores) থাকে, যা দ্রুত ছাঁকন বা আদান-প্রদানে সাহায্য করে। সাধারণ কৈশিক জালিকায় একপ্রান্তে ধমনী ও অন্যপ্রান্তে শিরা থাকে। কিন্তু গ্লোমেরুলাস একটি ব্যতিক্রমী জালিকা, যার উভয় প্রান্তেই ধমনিকা থাকে (ঢোকার মুখে Afferent Arteriole এবং বেরোনোর মুখে Efferent Arteriole)।

3. বহির্মুখী ধমনিকা বা ইফারেন্ট আর্টেরিওল (Efferent Arteriole): 

            কৈশিক নালীগুলো আবার একত্রিত হয়ে একটি একক নল হিসেবে বওম্যান্স ক্যাপসুল থেকে বের হয়ে আসে। মনে রাখার বিষয় হলো, এই বহির্মুখী ধমনিকাটি অন্তর্মুখী ধমনিকার চেয়ে বেশ সরু বা সংকীর্ণ হয়। বহির্মুখী ধমনিকা বা ইফারেন্ট আর্টেরিওল (Efferent Arteriole) প্রাচীরে মসৃণ পেশী (Smooth Muscle) থাকে, যা রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। গ্লোমেরুলাস (Glomerulus) থেকে বের হওয়ার পরে এটি পেরিটিউবুলার কৈশিক জালিকা (Peritubular Capillaries) অথবা ভাসা রেক্টা (Vasa Recta) গঠন করে।

4. পোডোসাইটের আবরণ: 

            গ্লোমেরুলাসের এই কৈশিক জালিকাগুলোকে বাইরে থেকে বওম্যান্স ক্যাপসুলের ভিসেরাল স্তরের পোডোসাইট (Podocyte) কোশগুলো আঙুলের মতো প্রবর্ধক দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখে। Podocyte কোশ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে Podocyte-এ Click করুন: Podocyte


গ্লোমেরুলাস কীভাবে কাজ করে? (Mechanism of Function)

 গ্লোমেরুলাসের কাজ করার মূল চাবিকাঠি হলো এর ভেতরের উচ্চ রক্তচাপ। 

 1. হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপ (Glomerular Hydrostatic Pressure):  রক্ত অন্তর্মুখী ধমনিকা(Afferent Arteriole) দিয়ে গ্লোমেরুলাসে ঢোকে সেটি চওড়া, কিন্তু বহির্মুখী ধমনিকা বা ইফারেন্ট আর্টেরিওল (Efferent Arteriole) দিয়ে বের হয় যেটা সরু। এর ফলে গ্লোমেরুলাসের ভেতরের কৈশিক জালিকায় একটি তীব্র তরল চাপ বা হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপের সৃষ্টি হয় (যার মান প্রায় 60 mmHg)। এই চাপটি রক্তরসকে গ্লোমেরুলার মেমব্রেন ভেদ করে বওম্যান্স ক্যাপসুলে যেতে বাধ্য করে। এটি পরিশ্রুতকরণের অনুকূলে (filtration-promoting) কাজ করে।

2. আল্ট্রাফিল্ট্রেশন (Ultrafiltration): হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপের কারণে রক্তের প্লাজমা বা রক্তরসে দ্রবীভূত থাকা জল, গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড, ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড এবং খনিজ লবণগুলো কৈশিক নালীর গায়ের সূক্ষ্ম ছিদ্র (Fenestrations) গলে বাইরে বওম্যান্স স্পেসে (Bowman’s Space) বেরিয়ে আসে।

3.  রক্তকণিকা আটকে দেওয়া: রক্তের লোহিত রক্তকণিকা (RBC), শ্বেত রক্তকণিকা (WBC), অণুচক্রিকা এবং বড় আকারের প্লাজমা প্রোটিনগুলো আকারে বড় হওয়ায় এই ছাঁকনি পার হতে পারে না। সেগুলো বহির্মুখী ধমনিকা দিয়ে আবার মূল রক্তপ্রবাহে ফিরে যায়। 

এই প্রক্রিয়ায় যে পরিশ্রুত তরলটি বওম্যান্স ক্যাপসুলে জমা হয়, তাকে গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেট বলে, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূত্রে পরিণত হয়।


গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন রেট (GFR)

             Glomerular Filtration Rate (GFR) বা গ্লোমেরুলার পরিশ্রুতকরণ হার হলো প্রতি মিনিটে দুটি বৃক্কের (Kidney) সমস্ত নেফ্রন মিলে মোট যে পরিমাণ তরল পরিশ্রুত বা ফিল্টার করে। একটি সুস্থ মানবদেহে এর স্বাভাবিক মান প্রতি মিনিটে প্রায় 125mL (বা দিনে প্রায় 180 লিটার রক্তরস পরিশ্রুত হয়, যার সিংহভাগ শরীর আবার শোষন করে নেয়)। Net Filtration Pressure(NFP)-এর ওপর ভিত্তি করেই রক্ত পরিশ্রুত হয়, তাই এই চাপের সামান্য পরিবর্তনও সরাসরি GFR-এর মানকে প্রভাবিত করে। সূত্রানুযায়ী, NFP বাড়লে GFR বাড়ে এবং NFP কমলে GFR কমে।


গ্লোমেরুলার পরিশ্রুতকরণ চাপ (Filtration Pressures)

            গ্লোমেরুলার পরিশ্রুতকরণ চাপ (Filtration Pressures) হলো সেই শারীরিক বল বা প্রেশার, যার কারণে গ্লোমেরুলাসের রক্তনালী থেকে রক্তরস ছেঁকে বওম্যান্স ক্যাপসুলের খালি জায়গায় (Bowman's Space) এসে জমা হয়। 

রক্ত ছাঁকনের এই পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত 3টি প্রধান চাপের পারস্পরিক টানাটানির ওপর নির্ভর করে। এদের মধ্যে একটি চাপ রক্তকে ছাঁকতে সাহায্য করে (অনুকূল চাপ), আর বাকি দুটি চাপ ছাঁকন প্রক্রিয়ায় বাধা দেয় (প্রতিকূল চাপ)। 

 1. হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপ (Glomerular Hydrostatic Pressure)(GHP): রক্ত অন্তর্মুখী ধমনিকা(Afferent Arteriole) দিয়ে গ্লোমেরুলাসে ঢোকে সেটি চওড়া, কিন্তু বহির্মুখী ধমনিকা বা ইফারেন্ট আর্টেরিওল (Efferent Arteriole) দিয়ে বের হয় যেটা সরু। এর ফলে গ্লোমেরুলাসের ভেতরের কৈশিক জালিকায় একটি তীব্র তরল চাপ বা হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপের সৃষ্টি হয় (যার মান প্রায় 60 mmHg)। এই চাপটি রক্তরসকে গ্লোমেরুলার মেমব্রেন ভেদ করে বওম্যান্স ক্যাপসুলে যেতে বাধ্য করে। এটি পরিশ্রুতকরণের অনুকূলে (filtration-promoting) কাজ করে। 

 2. Blood Colloid Osmotic Pressure (BCOP): রক্তের প্লাজমা প্রোটিনগুলো (যেমন অ্যালবুমিন, গ্লোবিউলিন) আকারে বড় হওয়ায় ছাঁকনি পার হতে পারে না এবং গ্লোমেরুলাসের রক্তনালীর ভেতরেই থেকে যায়। এই প্রোটিনগুলো জলের অণুকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে ধরে রাখতে চায়। ফলে প্রোটিনের এই অসমোটিক টান জলকে রক্তনালী থেকে বের হতে বাধা দেয় এবং ভেতরের দিকে টেনে রাখে। এটি পরিশ্রুতকরণের প্রতিকূলে (filtration-opposing) কাজ করে। এর মান সাধারণত প্রায় 32 mmHg. 

3. ক্যাপসুলার হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপ (CHP): বোম্যান্স ক্যাপসুলের লুমেন বা গহ্বরে আগে থেকেই যে পরিশ্রুত তরল (filtrate) জমা থাকে, তা নতুন করে তরল আসার পথে একটি বিপরীতমুখী বাধা বা চাপ সৃষ্টি করে। এটি পরিশ্রুতকরণের প্রতিকূলে (filtration-opposing) কাজ করে। এর মান সাধারণত প্রায় 18 mmHg.

গ্লোমেরুলাসে পরিস্রবণ ঘটানোর জন্য কার্যকর নিট চাপকে গ্লোমেরুলার পরিশ্রুতকরণ চাপ (Net Filtration Pressure) বলে, যার মান সাধারণত 10 mmHg।

NFP = GHP - (BCOP + CHP)
NFP = 60 − (32 + 18) mmHg
        = 10 mmHg

Note: যদি কোনো কারণে শরীরের রক্তচাপ কমে গিয়ে -এর মান 50mmHg বা তার নিচে নেমে যায়, তবে শূন্য (0) হয়ে যাবে এবং কিডনি রক্ত ছাঁকা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে।


Clinical Note: ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন বা অটোইমিউন রোগের কারণে গ্লোমেরুলাসে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন হতে পারে, যাকে গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস (Glomerulonephritis) বলা হয়। এতে গ্লোমেরুলাসের ছাঁকনি নষ্ট হয়ে যায় এবং প্রস্রাবের সাথে রক্ত (RBC) ও প্রোটিন বের হতে শুরু করে।


ফিল্ট্রেশন স্লিট (Filtration Slit)

নেফ্রনের ফিল্ট্রেশন ব্যারিয়ারের সবচেয়ে ভেতরের স্তরটি হলো পডোসাইট কোষের ফিল্ট্রেশন স্লিট (Filtration Slit)। ফিল্ট্রেশন স্লিট (Filtration Slit) হলো আমাদের কিডনির ছাঁকনি ব্যবস্থার (Glomerular Filtration Barrier) একেবারে শেষ এবং সবচেয়ে সূক্ষ্ম কপাটক বা গেটকিপার। সহজ ভাষায়, পাশাপাশি দুটি পডোসাইট কোশের আঙুলের মতো প্রবর্ধকগুলোর (Foot processes বা পেডিসেল) মাঝে যে অতি ক্ষুদ্র ফাঁকা জায়গা বা ছিদ্র থাকে, তাকেই ফিল্ট্রেশন স্লিট বলে। 

যদি আপনি দুই হাতের আঙুলগুলোকে একটির ভেতর আরেকটি ঢুকিয়ে লক করে দেন, তবে আঙুলগুলোর মাঝে যে সরু ফাঁক তৈরি হবে—সেটাই হলো ফিল্ট্রেশন স্লিট। এই ছিদ্রগুলো এতটাই অনুবীক্ষণিক যে এদের চওড়া বা ব্যাস মাত্র 2০ থেকে 3০ ন্যানোমিটার (nm)।


স্লিট ডায়াফ্রাম (Slit Diaphragm):

 ফিল্ট্রেশন স্লিটটি কেবল একটি সাধারণ খালি জায়গা বা ফাঁক নয়, এটি বিশেষ কিছু প্রোটিন দিয়ে তৈরি একটি অত্যন্ত জটিল জালিকা বা ডায়াফ্রাম (Slit Diaphragm)।এটি অনেকটা জিপার বা চেইনের মতো কাজ করে দুটি পডোসাইটের পা-কে নির্দিষ্ট দূরত্বে আটকে রাখে। একটি পডোসাইট কোষের পায়ের মতো প্রবর্ধক (Pedicel) যখন অন্য একটি পডোসাইটের প্রবর্ধকের পাশে বসে, তখন তাদের মাঝখানের প্রায় 4০ ন্যানোমিটার (nm) চওড়া ফাঁকা জায়গাটিকে জিপারের মতো আটকে রাখে কিছু বিশেষ ট্রান্সমেমব্রেন প্রোটিন।


এই কাঠামোর প্রধান উপাদানগুলো হলো: 

  • নেফ্রিন (Nephrin): এটি স্লিট ডায়াফ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন। দুই পাশের পডোসাইট থেকে নেফ্রিন প্রোটিনগুলো বের হয়ে মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় একে অপরের সাথে যুক্ত হয় (Homophilic interaction)। এটি দেখতে ঠিক একটি জিপার (Zip) বা চেইনের দাঁতগুলোর মতো দেখায়, যা মাঝখানে একটি ছাঁকনি তৈরি করে। 
  • নেফ-1 (NEPH1) এবং নেফ-2 (NEPH2): এগুলোও ট্রান্সমেমব্রেন প্রোটিন যা নেফ্রিনের মতোই দুই পাশের কোষকে মাঝখানে যুক্ত করতে সাহায্য করে এবং নেফ্রিনের গঠনকে স্থায়িত্ব দেয়। 
  • পডোক্যালিক্সিন (Podocalyxin): পডোসাইটের বাইরের আবরণে এই প্রোটিনটি থাকে। এটি অত্যন্ত নেগেটিভ চার্জযুক্ত (Sialic acid সমৃদ্ধ)। এই নেগেটিভ চার্জের কারণে দুটি পাশাপাশি পেডিকল একে অপরকে দূরে ঠেলে রাখে, যার ফলে স্লিটের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটি বা পথটি সবসময় খোলা থাকে।

কোষের ভেতরের সংযোগ (Intracellular Signaling & Anchor)

 স্লিট ডায়াফ্রামের এই প্রোটিনগুলো কোষের বাইরে বর্জ্য ছাঁকার কাজ করলেও, কোষের ভেতরে এরা পডোসাইটের নিজস্ব কঙ্কাল বা অ্যাক্টিন সাইটোস্কেলেটনের (Actin Cytoskeleton) সাথে শক্তভাবে যুক্ত থাকে। 

  • পডোছিন (Podocin): এটি কোষের মেমব্রেনের ভেতরের দিকে থাকা একটি প্রোটিন। এটি নেফ্রিন এবং নেফ-1 প্রোটিনকে পডোসাইটের ভেতরের কোষীয় কাঠামোর সাথে নোঙর (Anchor) করে ধরে রাখে। 
  • CD2AP এবং ZO-1: এগুলো অ্যাডাপ্টর প্রোটিন হিসেবে কাজ করে, যা নেফ্রিন এবং পডোছিন থেকে সংকেত বা টান সরাসরি অ্যাক্টিন ফিলামেন্টে (Actin filaments) পৌঁছে দেয়। এই সংযোগের কারণেই পডোসাইট কোষগুলো রক্তের প্রচণ্ড হাইড্রোস্ট্যাটিক প্রেশার বা চাপেও নিজেদের জায়গা থেকে বিচ্যুত হয় না।


ফিল্ট্রেশনের আণবিক মেকানিজম (How it works) 

নেফ্রিন ও অন্যান্য প্রোটিনের এই জিপার আকৃতির বিন্যাসের কারণে স্লিটের মাঝে মাত্র 4 থেকে 11 ন্যানোমিটার (nm) আকারের ছোট ছোট ছিদ্র বা পোর (Pores) তৈরি হয়। ফলে জল, আয়ন, গ্লুকোজ এবং ইউরিয়ার মতো ছোট অণু অনায়াসে এই ছিদ্র গলে বোম্যান্স ক্যাপসুলে চলে যায়। কিন্তু অ্যালবুমিনের মতো বড় প্লাজমা প্রোটিন (যার ব্যাস প্রায় 7 nm এবং নেগেটিভ চার্জযুক্ত) এই জটিল আণবিক জালের বাধা টপকাতে পারে না।


ক্লিনিকাল গুরুত্ব: 

যদি জিনগত ত্রুটির কারণে শরীরে নেফ্রিন বা পডোছিন প্রোটিন ঠিকমতো তৈরি না হয়, তবে এই স্লিট ডায়াফ্রাম ভেঙে যায়। এর ফলে প্রস্রাবের সাথে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন শরীর থেকে বের হয়ে যায়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় নেফ্রোটিক সিন্ড্রোম (Nephrotic Syndrome) বা প্রোটিনুরিয়া বলা হয়।


পডোসাইট (Podocytes)

 

পডোসাইট (Podocytes) হলো মানবদেহের বৃক্কের (Kidney) ম্যালপিজিয়ান কর্পাসলের বোম্যান্স ক্যাপসুল (Bowman's capsule)-এর ভিসেরাল স্তরে অবস্থিত এক ধরণের বিশেষ রূপান্তরিত এপিথেলিয়াল বা আবরণী কোশ।


নাম ও নামকরণ 

গ্রিক শব্দ 'Podo' শব্দের অর্থ হলো পা (Foot) এবং 'Cyte' শব্দের অর্থ হলো কোশ (Cell)। এদের কোশদেহ থেকে অসংখ্য আঙুল বা পায়ের মতো প্রবর্ধক (Extensions) বের হয়, যা গ্লোমেরুলাসের রক্তজালিকা বা কৈশিকনালিগুলোকে জড়িয়ে রাখে। এই বিশেষ গঠনের জন্যই এদের নাম 'পডোসাইট'।


গঠনগত বৈশিষ্ট্য 

একটি পডোসাইট কোশ প্রধানত তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত: 

  1. প্রধান কোশদেহ (Cell Body): এই অংশে কোশের নিউক্লিয়াস এবং অন্যান্য প্রধান অঙ্গাণু থাকে। এটি বোম্যান্স ক্যাপসুলের ভেতরের ফাঁকা জায়গার দিকে মুখ করে থাকে। 
  2. প্রাথমিক প্রবর্ধক (Primary Processes): কোশদেহ থেকে কিছু বড় বড় শাখার মতো প্রবর্ধক বের হয়।
  3.  পদতল বা পেডিসেল (Foot Processes বা Pedicels): প্রাথমিক প্রবর্ধকগুলো থেকে আরও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আঙুলের মতো অংশ বের হয়। দুটি পাশাপাশি পডোসাইট কোশের এই পেডিসেলগুলো একে অপরের সাথে ইন্টারলক বা চিরুনির দাঁতের মতো আটকে থাকে।


ছাঁকন প্রণালী (Filtration Slit) 

পাশাপাশি দুটি পেডিসেলের মধ্যবর্তী অতি ক্ষুদ্র ফাঁকা স্থানকে ফিল্ট্রেশন স্লিট (Filtration Slit) বা ছাঁকন ছিদ্র বলা হয়। এই ছিদ্রগুলির ব্যাস প্রায় 20-30 ন্যানোমিটার(nm)। এই ছিদ্রগুলো নেফ্রিন (Nephrin) এবং পডোসিন (Podocin) নামক বিশেষ প্রোটিন দ্বারা গঠিত একটি জালের মতো পর্দা বা ডায়াফ্রাম দিয়ে ঢাকা থাকে।


প্রধান কাজসমূহ

কিডনির রক্ত পরিশ্রুত বা ফিল্টার করার ক্ষেত্রে পডোসাইট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে: 

1. আল্ট্রাফিল্ট্রেশন বা অতিপরিষ্রাবণ: 

এরা গ্লোমেরুলাসের রক্তনালি থেকে জল, গ্লুকোজ, খনিজ লবণ এবং ইউরিয়ার মতো বর্জ্য পদার্থকে ছেঁকে বোম্যান্স ক্যাপসুলে প্রবেশ করতে দেয়।

2. প্রোটিন আটকে রাখা: 

 রক্তের প্রয়োজনীয় প্রোটিন (যেমন- অ্যালবুমিন) এবং লোহিত রক্তকণিকা যাতে ছাঁকনি গলে মূত্রের সাথে বেরিয়ে না যায়, পডোসাইট তা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করে। 

3. রক্তনালির সুরক্ষা: 

 গ্লোমেরুলাসের রক্তনালির ভেতরের উচ্চ রক্তচাপের বিরুদ্ধে এরা বাইরে থেকে গাঠনিক সাপোর্ট দেয়, যাতে রক্তনালিগুলো ফেটে না যায়।


চিকিৎসাগত গুরুত্ব: 

পডোসাইট কোশগুলো একবার নষ্ট হয়ে গেলে সহজে আর নতুন করে তৈরি বা বিভাজিত হতে পারে না। কোনো কারণে (যেমন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা নেফ্রোটি সিন্ড্রোম) পডোসাইট ক্ষতিগ্রস্ত হলে ছাঁকনি আলগা হয়ে যায় এবং মূত্রের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন শরীর থেকে বেরিয়ে যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় প্রোটিনুরিয়া (Proteinuria) বলা হয়।


গ্লোমেরুলার বেসমেন্ট মেমব্রেন (GBM)

 



গ্লোমেরুলার বেসমেন্ট মেমব্রেন (Basement Membrane বা Basal Lamina) হলো গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন ব্যারিয়ারের  দ্বিতীয় বা মাঝখানের স্তর। এটি এন্ডোথেলিয়াল কোষ (প্রথম স্তর) এবং পডোসাইট কোষের (তৃতীয় স্তর) ঠিক মাঝখানে অবস্থিত একটি কোষবিহীন, ঘন এবং জেলের মতো আণবিক পর্দা। কিডনিতে রক্ত ছাঁকার প্রক্রিয়ায় গ্লোমেরুলার বেসমেন্ট মেমব্রেন (GMB) একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নিখুঁত চালনী (Sieve) হিসেবে কাজ করে।


গঠন এবং বিন্যাস (Structural Organization):

    গ্লোমেরুলার বেসমেন্ট মেমব্রেনটি (GBM) মূলত তিনটি সূক্ষ্ম স্তরে বিভক্ত। ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে এটি নিচে বর্ণিত বিন্যাসে দেখা যায়: 

  1. ল্যামিনা রারা ইন্টার্না (Lamina Rara Interna): এটি ভেতরের দিকের পাতলা স্তর, যা এন্ডোথেলিয়াল কোষের সংস্পর্শে থাকে।
     
  2. ল্যামিনা ডেনসা (Lamina Densa): এটি মাঝখানের সবচেয়ে ঘন এবং পুরু স্তর। এটি মূলত কোলাজেন প্রোটিনের একটি জটিল জাল দিয়ে তৈরি.
     
  3. ল্যামিনা রারা এক্সটার্না (Lamina Rara Externa): এটি বাইরের দিকের পাতলা স্তর, যা পডোসাইট কোষের পেডিকল বা পায়ের সাথে যুক্ত থাকে।


 

 গ্লোমেরুলার বেসমেন্ট মেমব্রেনটি (GBM) কোনো জীবন্ত কোষ দিয়ে তৈরি নয়, বরং এটি নির্দিষ্ট কিছু বিশেষায়িত প্রোটিন এবং গ্লাইকোপ্রোটিনের সমন্বয়ে গঠিত: 

  1. টাইপ 4 কোলাজেন (Type IV Collagen):
    এটি বেসমেন্ট মেমব্রেনের প্রধান কাঠামোগত উপাদান। এই প্রোটিনের তন্তুগুলো পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে একটি ত্রিমাত্রিক আণবিক জাল (Meshwork) তৈরি করে। এই জালের ফাঁকগুলোই মূলত অণু ছাঁকার জন্য মাইক্রোস্কোপিক ছিদ্র হিসেবে কাজ করে।
     
  2. ল্যামিনিন (Laminin):
    এই প্রোটিনটি বেসমেন্ট মেমব্রেনকে দুই পাশের কোষের (এন্ডোথেলিয়াম ও পডোসাইট) সাথে শক্তভাবে আটকে রাখতে বা নোঙর করতে সাহায্য করে।
     
  3. হেপারান সালফেট প্রোটিওগ্লাইকান (Agrin & Perlecan):
    এটি  গ্লোমেরুলার বেসমেন্ট মেমব্রেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান। হেপারান সালফেটের কারণে বেসমেন্ট মেমব্রেনে প্রচুর পরিমাণে নেগেটিভ ইলেকট্রিকাল চার্জ (-) জমা থাকে।


গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশনে এর দ্বৈত ভূমিকা (Dual Barrier Function) 

বেসমেন্ট মেমব্রেন রক্ত থেকে উপাদানগুলো আলাদা করার জন্য একসাথে দুটি ভিন্ন উপায়ে ছাঁকনি বা বাধা (Barrier) হিসেবে কাজ করে: 

  1. সাইজ ব্যারিয়ার বা আকার ভিত্তিক ছাঁকন (Size Barrier):

    টাইপ 4 কোলাজেনের তৈরি আণবিক জালের ছিদ্রগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম হয়। এর মধ্য দিয়ে কেবল 1 থেকে 8 ন্যানোমিটার (nm) আকারের ছোট অণুগুলোই পার হতে পারে। জল, ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন, গ্লুকোজ এবং লবণ অনায়াসে এই জাল গলে চলে যায়। কিন্তু যেসব প্রোটিন বা অণুর ব্যাস 8 ন্যানোমিটারের (nm)বেশি, তারা এই জালে আটকে যায় এবং রক্তেই থেকে যায়।
     
  2.  চার্জ ব্যারিয়ার বা আধান ভিত্তিক ছাঁকন (Charge Barrier):

    গ্লোমেরুলার বেসমেন্ট মেমব্রেনে থাকা হেপারান সালফেটের তীব্র নেগেটিভ চার্জ (-) এখানে একটি অদৃশ্য বৈদ্যুতিক প্রাচীর তৈরি করে। রক্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্লাজমা প্রোটিন অ্যালবুমিন (Albumin)-এর আকার প্রায় 3.6 ন্যানোমিটার(nm), যা তাত্ত্বিকভাবে এই সাইজ ব্যারিয়ার পার হওয়ার কথা। কিন্তু অ্যালবুমিনের চার্জও নেগেটিভ হওয়ায়, সমধর্মী চার্জের বিকর্ষণের কারণে বেসমেন্ট মেমব্রেন অ্যালবুমিনকে ধাক্কা দিয়ে রক্তে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।


ক্লিনিকাল গুরুত্ব (Clinical Significance)

যদি কোনো কারণে বেসমেন্ট মেমব্রেনের গঠন বা রাসায়নিক উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে কিডনির কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়:

1. গুডপাসচার সিন্ড্রোম (Goodpasture's Syndrome):

এটি একটি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত টাইপ 4 কোলাজেনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে বেসমেন্ট মেমব্রেন ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে প্রস্রাবের সাথে রক্ত ও প্রোটিন [অ্যালবুমিন (Albumin)]বের হয়।

2. অ্যালপোর্ট সিন্ড্রোম (Alport Syndrome):

এটি একটি জন্মগত বা জিনগত ত্রুটি, যেখানে টাইপ 4 কোলাজেন সঠিকভাবে তৈরি হতে পারে না। এর ফলে বেসমেন্ট মেমব্রেন সময়ের সাথে সাথে পাতলা বা অনিয়মিত হয়ে ভেঙে যায়, যা ধীরে ধীরে কিডনি বিকল হওয়ার দিকে নিয়ে যায়।

3. ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি (Diabetic Nephropathy):

দীর্ঘস্থায়ী অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে বেসমেন্ট মেমব্রেনের নেগেটিভ চার্জযুক্ত হেপারান সালফেট নষ্ট হয়ে যায় (Loss of charge barrier)। এর ফলে প্রস্রাবে অ্যালবুমিন প্রোটিন লিক হতে শুরু করে, যাকে মাইক্রোঅ্যালবুমিনুরিয়া (Microalbuminuria) বলা হয়।


ফেনস্ট্রেশন বা এন্ডোথেলিয়াল পোরস (Fenestrations / Endothelial Pores)



ফেনস্ট্রেশন বা এন্ডোথেলিয়াল পোরস (Fenestrations / Endothelial Pores) হলো গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন ব্যারিয়ারের (ছাঁকনি) একেবারে প্রথম স্তর। রক্ত যখন গ্লোমেরুলাসের কৈশিক জালিকায় (Capillaries) প্রবেশ করে, তখন রক্তের প্লাজমা এবং বর্জ্য পদার্থকে বোম্যান্স ক্যাপসুলে পৌঁছানোর জন্য সবার আগে এই এন্ডোথেলিয়াল পোরস বা ছিদ্রগুলো পার হতে হয়। 


 অবস্থান এবং আণবিক গঠন (Location & Structure)

 গ্লোমেরুলার ক্যাপিলারির ভেতরের দেয়ালটি যে এককোষী স্তর দিয়ে তৈরি, তাকে এন্ডোথেলিয়াম (Endothelium) বলে। এই এন্ডোথেলিয়াল কোষগুলোর গায়ে অসংখ্য ছোট ছোট গোলাকার ছিদ্র থাকে, যাদের ফেনস্ট্রেশন (Fenestration) বলা হয়। 

 এই ছিদ্রগুলোর ব্যাস সাধারণত 7০ থেকে 1০০ ন্যানোমিটার (nm) হয়ে থাকে। শরীরের অন্যান্য সাধারণ ক্যাপিলারির তুলনায় গ্লোমেরুলার ক্যাপিলারির ফেনস্ট্রেশনগুলো সংখ্যায় অনেক বেশি এবং আকারে বড় হয়, যা দ্রুত রক্ত ছাঁকতে সাহায্য করে। 

 ডায়াফ্রামের অনুপস্থিতি (Lack of Diaphragm): 

শরীরের অন্যান্য অংশের ফেনস্ট্রেটেড ক্যাপিলারিতে ছিদ্রগুলোর মুখে একটি পাতলা পর্দা বা ডায়াফ্রাম থাকে। কিন্তু কিডনির গ্লোমেরুলাসের ফেনস্ট্রেশনে কোনো ডায়াফ্রাম থাকে না (Non-diaphragmed)। ফলে রক্ত থেকে তরল ও ছোট উপাদানগুলো অত্যন্ত উচ্চ গতিতে সরাসরি পার হতে পারে। 


গ্লাইকোক্যালিক্সের ভূমিকা (The Glycocalyx Layer) 

    যদিও এই ছিদ্রগুলোর আকার 7০-1০০ nm (যা 7 nm ব্যাসের অ্যালবুমিন প্রোটিনের চেয়ে অনেক বড়), তবুও স্বাভাবিক অবস্থায় বড় প্রোটিনগুলো এই স্তরটি সহজে পার হতে পারে না। এর কারণ হলো এন্ডোথেলিয়াল গ্লাইকোক্যালিক্স (Endothelial Glycocalyx)। 

এন্ডোথেলিয়াল গ্লাইকোক্যালিক্স (Endothelial Glycocalyx),  এন্ডোথেলিয়াল কোষ এবং ফেনস্ট্রেশনের ওপর লেগে থাকা একটি অত্যন্ত পাতলা, জেলের মতো আণবিক স্তর। 

  এন্ডোথেলিয়াল গ্লাইকোক্যালিক্স (Endothelial Glycocalyx) মূলত প্রোটিওগ্লাইকান (Proteoglycans) এবং গ্লাইকোসামিনোগ্লাইকান (যেমন- হেপারান সালফেট) দিয়ে তৈরি। 

 এন্ডোথেলিয়াল গ্লাইকোক্যালিক্স (Endothelial Glycocalyx) স্তরটি তীব্র নেগেটিভ চার্জযুক্ত (-) হয়। ফলে রক্তের প্লাজমায় থাকা নেগেটিভ চার্জযুক্ত প্রোটিনগুলো (যেমন- অ্যালবুমিন) এই ছিদ্রের কাছে আসতেই বিকর্ষিত (Repel) হয়ে দূরে সরে যায়। 


 কী পার হয় আর কী আটকে যায়? 

   পার হয়:   জল, বিভিন্ন আয়ন (Na+, K+, Cl-), গ্লুকোজ, অ্যামাইনো অ্যাসিড, ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন এবং ছোট আকারের পেপটাইড হরমোন। এই উপাদানগুলোর আকার ফেনস্ট্রেশনের চেয়ে অনেক ছোট হওয়ায় এরা বাধাহীনভাবে কোষে প্রবেশ করতে পারে। 

   আটকে যায়: রক্তকণিকাগুলো (লোহিত রক্তকণিকা বা RBC, শ্বেত রক্তকণিকা বা WBC এবং অণুচক্রিকা বা Platelets) আকারে অত্যন্ত বড় হওয়ায় (যেমন একটি RBC-র আকার প্রায় 7,০০০ nm) এই 7০-1০০ nm ছিদ্র দিয়ে কোনোভাবেই গলে বের হতে পারে না। 


 ক্লিনিকাল গুরুত্ব (Clinical Significance) 

    যদি কোনো রোগে গ্লোমেরুলার এন্ডোথেলিয়াম ক্ষতিগ্রস্ত হয় (যেমন- Pre-eclampsia বা তীব্র কিডনি ইনফেকশন/Glomerulonephritis), তখন এই ফেনস্ট্রেশনগুলোর গঠন নষ্ট হয়ে যায় এবং গ্লাইকোক্যালিক্স স্তরটি ধুয়ে মুছে যায়। এর ফলে: 

1. নেগেটিভ চার্জের বাধা চলে যায়, যার কারণে প্রস্রাবের সাথে প্রোটিন বের হতে শুরু করে। 

2. ছিদ্রগুলোর ক্ষতি হলে লোহিত রক্তকণিকা (RBC) লিক হয়ে বোম্যান্স ক্যাপসুলে চলে আসে, যার ফলে প্রস্রাবের সাথে রক্ত নির্গত হয়। এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় হেমাটুরিয়া (Hematuria) বলা হয়।


এন্ডোথেলিয়াল গ্লাইকোক্যালিক্স (Endothelial Glycocalyx)

 



এন্ডোথেলিয়াল গ্লাইকোক্যালিক্স (Endothelial Glycocalyx) হলো রক্তনালীর ভেতরের দেয়ালে থাকা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সূক্ষ্ম এবং জেলের মতো আণবিক স্তর। সরল ভাষায় বলতে গেলে, এটি আমাদের রক্তনালীর ভেতরের লাইনিং বা এন্ডোথেলিয়াল কোষগুলোর ওপর লেগে থাকা একটি "কার্পেট" বা "চুল সদৃশ" প্রতিরক্ষামূলক আবরণ। 

কিডনির গ্লোমেরুলাসে রক্ত ছাঁকার ক্ষেত্রে এই স্তরটি একটি প্রথম সারির দ্বাররক্ষী (Gatekeeper) হিসেবে কাজ করে। 

 রাসায়নিক ও আণবিক গঠন (Chemical & Molecular Structure) 

গ্লাইকোক্যালিক্স মূলত শর্করা (Carbohydrates) এবং প্রোটিনের জটিল মিশ্রণে তৈরি। এর প্রধান  উপাদানগুলো হলো:

  •  প্রোটিওগ্লাইকান (Proteoglycans): এগুলো হলো কোর-প্রোটিন, যা এন্ডোথেলিয়াল কোষের মেমব্রেনের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকে (যেমন- Syndecan-1, Glypican-1)। 
  • গ্লাইকোসামিনোগ্লাইকান (GAGs): এগুলো প্রোটিওগ্লাইকানের সাথে যুক্ত লম্বা শর্করার শৃঙ্খল। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হেপারান সালফেট (Heparan sulfate) এবং কনড্রইটিন সালফেট (Chondroitin sulfate)। এছাড়া মুক্ত অবস্থায় থাকে হায়ালুরোনান (Hyaluronan)।
  •  গ্লাইকোপ্রোটিন (Glycoproteins): বিভিন্ন কোষীয় আঠালো অণু (যেমন- CAMs) এবং রিসেপ্টর এই স্তরে থাকে। তীব্র নেগেটিভ চার্জ (-): হেপারান সালফেটের উপস্থিতির কারণে পুরো গ্লাইকোক্যালিক্স স্তরটি প্রচণ্ড নেগেটিভ ইলেকট্রিকাল চার্জযুক্ত হয়। গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশনে এই চার্জের ভূমিকাই সবচেয়ে প্রধান। 
  • সায়ালিক অ্যাসিড (Sialic Acid) 
 গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশনে এর মূল কাজ (Functions in Kidney Filtration) :

    গ্লোমেরুলাসের ভেতরে যে এন্ডোথেলিয়াল পোর বা ফেনস্ট্রেশন (ছিদ্র) থাকে, তার ব্যাস প্রায় 70-1০০ ন্যানোমিটার (nm)। অথচ রক্তের প্রধান প্রোটিন অ্যালবুমিনের ব্যাস মাত্র 7 nm। গ্লাইকোক্যালিক্স না থাকলে সব প্রোটিন এই বড় ছিদ্র দিয়ে গলে প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যেত। গ্লাইকোক্যালিক্স এটি দুটি উপায়ে আটকায়: 
  1. চার্জ ব্যারিয়ার (Charge Barrier): অ্যালবুমিন প্রোটিনের নিজস্ব চার্জও নেগেটিভ (-)। সমধর্মী চার্জ একে অপরকে বিকর্ষণ করে—এই পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে নেগেটিভ চার্জযুক্ত গ্লাইকোক্যালিক্স অ্যালবুমিনকে ফেনস্ট্রেশনের মুখের কাছে আসতেই দেয় না, রক্তেই ফেরত পাঠিয়ে দেয়। 
  2. সাইজ ফিল্টার (Size Filter): জেলের মতো ঘন আণবিক জালের কারণে এটি একটি প্রাথমিক ছাঁকনি তৈরি করে, যা রক্তকণিকা এবং বড় অণুগুলোকে আটকে দেয়, কিন্তু জল ও ছোট আয়নগুলোকে সহজেই ফেনস্ট্রেশনের ভেতর দিয়ে যেতে দেয়। 

রক্তনালীতে গ্লাইকোক্যালিক্সের অন্যান্য সাধারণ কাজ

 কিডনির বাইরে, সারা শরীরের রক্তনালীতেও গ্লাইকোক্যালিক্সের বিশাল ভূমিকা রয়েছে: 
  1. রক্তপ্রবাহ সচল রাখা (Vascular Homeostasis): এটি রক্তনালীর দেয়ালকে মসৃণ রাখে, যার ফলে লোহিত রক্তকণিকা এবং অণুচক্রিকা (Platelets) নালীর দেয়ালে আটকে বা জমাট বেঁধে যায় না। 
  2. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ (Shear Stress Transduction): রক্তপ্রবাহের ঘর্ষণ বা টান (Shear stress) অনুভব করে এটি এন্ডোথেলিয়াল কোষকে নাইট্রিক অক্সাইড (NO) তৈরি করার সংকেত দেয়, যা রক্তনালীকে প্রসারিত করে রক্তচাপ কমায়। 
  3. প্রদাহ রোধ (Anti-inflammatory): ইনফেকশন বা প্রদাহের সময় শ্বেত রক্তকণিকা (WBC) যাতে সরাসরি রক্তনালীর দেয়ালে লেগে ক্ষতি না করতে পারে, এটি সেই দেওয়ালকে ঢেকে রাখে। 
গ্লাইকোক্যালিক্সের ক্ষতি এবং তার ফলাফল 

এন্ডোথেলিয়াল গ্লাইকোক্যালিক্স অত্যন্ত সংবেদনশীল। কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই স্তরটি "শেড" বা ধুয়ে মুছে নষ্ট হয়ে যেতে পারে:

গ্লাইকোক্যালিক্স ধ্বংসের কারণ এর ফলে শরীরে যা ঘটে (Consequences)
দীর্ঘমেয়াদী ডায়াবেটিস (High Blood Sugar) প্রোটিনুরিয়া (Proteinuria): চার্জ ব্যারিয়ার নষ্ট হওয়ায় প্রস্রাব দিয়ে প্রচুর অ্যালবুমিন প্রোটিন বেরিয়ে যায়।
উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension) এডিমা (Edema): রক্তনালী লিক হয়ে জল চারপাশের কলা বা টিস্যুতে জমে শরীর ফুলে যায়।
সেপসিস বা তীব্র ইনফেকশন (Sepsis) অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস: রক্তনালীর দেয়ালে কোলেস্টেরল ও চর্বি সহজে জমাট বাঁধার সুযোগ পায়।